হেমায়েত উদ্দিন বীরবিক্রম
১৯৭১ সালে স্বাধীন বাংলাদেশের ঊষালগ্নে মুক্তিযুদ্ধ বলতে প্রতিপক্ষ পাক হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়মিত সেনাবাহিনীর মত নিয়মতান্ত্রিক কোনো যুদ্ধ ছিল না। নিরস্ত্র বাঙালির ওপর হায়েনাদের মত ঝাপিয়ে পড়া পাক বাহিনীকে যেখানে যে অবস্থায় পাওয়া গেছে সেখানেই অসংগঠিতভাবে কোনো সেনাকমাণ্ড ছাড়াই বিক্ষুব্ধ জনতার ভেতর থেকে অসমসাহসী তরুণরা স্থানীয়ভাবে সংগৃহীত ঘরে রাখা বন্দুক, পয়েন্ট ২২-বোর রাইফেল, থানা থেকে সংগ্রহ করা ৩০৩ রাইফেল নিয়ে পাচ-দশ মিনিটের প্রশিক্ষণ নিয়ে প্রতিরোধযুদ্ধে অংশ গ্রহণ করে। দেশের প্রত্যেক থানায় ডিউটিরত পুলিশের একটি অংশও প্রতিরোধ যোদ্ধাদের সহগামী হয়। তবে সেনানিবাস ও সীমান্ত এলাকার চিত্র ছিল একটু অন্য রকম। বাংলাদেশের পুরো সীমান্তে ডিউটিরত ইপিআর বাহিনীর প্রায় পুরোটাই নিয়ন্ত্রণে ছিল সম্পুণ সীমান্ত অঞ্চল। আর ইস্টবেঙ্গল রেজিমেন্টে নিয়মিত বাহিনী হিসেবে বিদ্রোহকারী বাঙালি সেনাদের অবস্থান ছিল মূলতঃ বাইরে ও মুক্তাঞ্চলে। দেশের অভ্যন্তরে স্বউদ্যোগে গঠিত মুক্তিযোদ্ধাদের বিভিন্ন যেসব বাহিনী গড়ে ওঠে তাদের মধ্যে অন্যতম হচ্ছে তৎকালীন ফরিদপুরের হেমায়েত বাহিনী। অন্যান্য বাহিনীর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে টাঙ্গাইলের কাদেরিয়া বাহিনী, সিরাজগঞ্জের লতিফ মির্জা বাহিনী, ঢাকার মায়া বাহিনী প্রভৃতি। এছাড়া নিয়মিত বাহিনীর মধ্যেও K-Force, S-Force, Z-Force ইত্যাদি নামে আলাদা আলাদা বাহিনী গড়ে ওঠে। এসব বাহিনীর কার্যক্রম পুরো মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে বাঙালি জাতির প্রাণস্পন্দন ও গৌরবে পরিণত হয়।
১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চের রাতের পর ১৯শে মার্চ তারিখে ঢাকার জয়দেবপুর সেনানিবাসে অবস্থানরত পাঞ্জাবি সৈন্যদের বিরুদ্ধে দ্বিতীয় ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের বিদ্রোহী সৈন্য এবং কর্মকর্তাগণ মুক্তিযুদ্ধকে সংগঠিত করার জন্য দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েন। বিদ্রোহী সৈন্যদের অন্যতম ব্যান্ডপার্টির হাবিলদার হেমায়েত উদ্দিন কয়েকজন সৈন্যকে নিয়ে ফরিদপুরে আসেন। এ সময় ফরিদপুরের স্থানীয় জনগণের সহযোগিতায় তিনি পাকিস্তানি সৈন্যদের প্রতিহত করলে বেশ কিছুদিন ফরিদপুর পাক সৈন্য মুক্ত থাকে। কিন্তু ঢাকা থেকে আধুনিক অস্ত্রসস্ত্রসহ পাকিস্তানি সৈন্যরা ফরিদপুর গেলে হেমায়েত উদ্দিন সঙ্গীদের নিয়ে ২৮ শে এপ্রিল নিজ গ্রাম কোটালিপাড়ার টুপুরিয়ায় সরে আসেন। এ সময় স্থানীয় রাজাকারেরা তাকে আত্মসমর্পন না করলে তার ছেলে এবং স্ত্রীকে ধরে নিয়ে যাওয়ার হুমকি প্রদান করে। হুমকির খবর শুনে হেমায়েতের স্ত্রী আত্মহত্যা করেন। হেমায়েত সেখান থেকে সরে গিয়ে স্থানীয় নেতৃবৃন্দের সহায়তায় মুক্তিবাহিনী গড়ে তোলেন। তিনি এবং তার সঙ্গীরা প্রথমেই কোটালিপাড়া থানা আক্রমন করে প্রচুর অস্ত্রশস্ত্র নিজেদের দখলে নেন।
হেমায়েত বাহিনী
কিছুদিনের মধ্যেই হেমায়েতের মুক্তিযোদ্ধাদের দলটি একটি বিরাট বাহিনীতে রূপ নেয়। এ বাহিনীতে সশস্ত্র মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা ছিল সর্বমোট ৫,৫৫৮ জন। এ বাহিনীর যুদ্ধক্ষেত্র বরিশালের উত্তরাঞ্চল, খুলনা-বাগেরহাট ও যশোরের কালিয়া সহ গোপালগঞ্জ এবং মাদারীপুরের পশ্চিমাংশ পর্যন্ত বিস্তৃত হয়। হেমায়েত বাহিনী পরিচালনার জন্য বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দের সমন্বয়ে একটি পরিচালনা কমিটি গঠন করা হয়েছিল। এ বাহিনী ৪২টি উপদলে বিভক্ত ছিল। প্রতিটি দলে কমান্ডার, সহকারী কমান্ডার নিযুক্ত করা হয়েছিল। তবে বিভিন্ন এলাকায় অভিযান পরিচালিত হত কেন্দ্রীয় ভাবে। মুক্তিযুদ্ধের শুরুতে কোটালিপাড়ার জহরেরকান্দি হাই স্কুলে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ কেন্দ্র স্থাপন করা হয়। হেমায়েত বাহিনীর মধ্যে বিচার বিভাগও ছিল। নিয়ম-শৃঙ্খলা ভঙ্গের কারণে ২ জন গ্রুপ কমান্ডার সহ মোট ৬ জন মুক্তিযোদ্ধাকে মৃত্যুদন্ড দেওয়া হয়েছিল।
তাঁর নেতৃত্বে ৩ ডিসেম্বর, ১৯৭১ তারিখে হেমায়েত বাহিনী গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়ায় প্রায় ৫০০ পাকিস্তানি সেনাকে পরাস্ত করে এই এলাকা শত্রুমুক্ত করে। ২ ডিসেম্বর রাতে ২৪ জন সাব কমান্ডার নিয়ে তিনি সিদ্ধান্ত নেন চূড়ান্ত আক্রমণের।
মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস সৃষ্টিকারী সেসব বিজয়গাথা শুনুন সেই বীর মুক্তিযোদ্ধার মুখেই:
"১৯৫৯ সালে ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টে যোগদানের পর প্রশিক্ষণ শেষে আমার প্রথম পোস্টিং হয় পশ্চিম পাকিস্তানে। পাকিস্তান সেনাবাহিনীর প্রশিক্ষক হিসেবে আমি সেখানে যোগদান করি। বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চ ভাষণের পর ৯ মার্চ স্ত্রী হাজেরা ও শিশুপুত্র হাসিবকে নিয়ে অ্যাবোটাবাদ ক্যান্টনমেন্ট ছেড়ে করাচিতে আসি। আবার ১৪ মার্চ পি আই এ'র একটি ফ্লাইটে ঢাকায় আসি। স্ত্রী-সন্তানকে সদরঘাট থেকে গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়ার টুপুরিয়ার গ্রামের বাড়িতে পাঠানোর জন্য একটি লঞ্চে তুলে দিই। এবং যোগ দিই ঢাকার জয়দেবপুরের ভাওয়াল রাজবাড়িতে দ্বিতীয় ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের সঙ্গে। পরে নিজ এলাকায় চলে আসি এবং নিজেই বাহিনী গড়ে তুলি। ৮ হাজার মুক্তিযোদ্ধাকে নিয়ে গড়ে তুলি হেমায়েত বাহিনী। আমাদের এই বাহিনীর লিয়াজোঁ কমিটি, জল্লাদ বাহিনী, প্রশিক্ষণ ইউনিট ও প্রশাসনিক ইউনিট নামে বেশ কয়েকটি কমিটি গঠন করা হয়েছিল। প্রশাসনিক ইউনিট মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য খাদ্য, অর্থ, রেশন, ওষুধ, জামা-কাপড় ও নৌকা সংগ্রহ করত। প্রতিটি ইউনিয়ন ও গ্রাম পর্যায়ে এই প্রশাসনিক ইউনিটের সাবকমিটি গঠন করা হয়েছিল। কোটালীপাড়ার কলাবাড়িতে চিত্তরঞ্জন গাইনের বাড়িতে একটি ট্রেনিং ক্যাম্প গড়ে তুলি, যেখানে পুরুষের পাশাপাশি নারীদেরও সামরিক ট্রেনিং দেয়া হতো। প্রথমে ৮০ জনের একটি দলকে ৩০৩ রাইফেল খোলা, জোড়া লাগানো, এইম করা এবং ফায়ারিং করা শিখিয়েছি। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে বেশ কয়েকটি সম্মুখযুদ্ধে অবতীর্ণ হয় আমাদের 'হেমায়েত বাহিনী'। উল্লেখযোগ্য যুদ্ধ হয় রামশীল, হরিণাহাটি, শেখ বাড়ির যুদ্ধ, কলাবাড়ির যুদ্ধ, মাটিভাঙ্গা, বাঁশবাড়িয়া, ঝনঝনিয়া, জহরের কান্দি, কোটালীপাড়া সদর প্রভৃতি স্থানে। এ ছাড়া ছোটখাটো যুদ্ধ হয়েছে আরো কয়েকটি। স্বাভাবিকভাবেই এসব যুদ্ধের নেতৃত্ব দিয়েছি আমি।
প্রথম যুদ্ধ
আমরা তিন তিনবার কোটালীপাড়া থানা আক্রমণ করেছি। প্রতিবারই বীরত্বের সঙ্গে সফল হয়েছি এবং অস্ত্র লুটে নিয়েছি। সেই অস্ত্র আমরা যুদ্ধে ব্যবহার করেছি। হেমায়েত বাহিনীর কোটালীপাড়ায় প্রথম যুদ্ধ হয় ২৮ এপ্রিল। সেদিনই আমি প্রথম গ্রামে প্রবেশ করি। এ খবর ছড়িয়ে পড়লে এলাকার লোকজন আমাকে দেখার জন্য ভিড় করতে থাকে। এদিন সকাল ৯টার দিকে কোটালীপাড়া থানা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদকের লেখা একটি চিঠি আসে আমার কাছে। চিঠিতে লেখা ছিল আওয়ামী লীগের ২৫-২৬ নেতা-কর্মীকে নজরবন্দী অবস্থায় থানায় আটকে রাখা হয়েছে। তাদের প্রাণে বাঁচানোর জন্য বিশেষ অনুরোধ করা হয়। চিঠিটি সহযোগীদের পড়ে শুনাই এবং সিদ্ধান্ত নিই তাদের উদ্ধারের। দেরি না করে আমরা তখনই থানার দিকে রওনা হই। কোটালীপাড়া থানা এলাকায় পৌঁছে আমি দুটি মেশিনগান থানার দিকে তাক করে অবস্থানের নির্দেশ দিই এবং নিজের এসএমজি'টি ফায়ারিং পজিশনে রেখে থানায় প্রবেশ করি। আমার সাজসজ্জা এবং লোকবল দেখে থানার সব পুলিশ ভয় পেয়ে যায়। কোনো যুদ্ধ ছাড়াই থানায় আটক আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীদের মুক্ত করে আনি। পরে ওই সব নেতাও হেমায়েত বাহিনীতে যোগ দেন।
হেমায়েত উদ্দিন মুক্তিযুদ্ধে কৃতিত্বের স্বীকৃতি হিসেবে 'বীর বিক্রম' খেতাবে ভূষিত হন।
হেমায়েত উদ্দিন ১৯৪১ সালের ৩রা ডিসেম্বর গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়া উপজেলার টুপুরিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতার নাম শেখ আবদুল করিম এবং মা ছখিনা বেগম।
হেমায়েত উদ্দিন বীরবিক্রম বর্তমানে 'বঙ্গবন্ধু একাডেমী' নামে একটি সংগঠনের সভাপতি।
স্বাধীনতার পর ১৯৭৩ সালের সাধারণ নির্বাচনের প্রাক্কালে ফরিদপুরের একটি আসনে প্রতিদ্বদন্ধী ন্যাপ (মোজাফ্ফর)-এর প্রার্থী কমলেশ বেদজ্ঞসহ ৪ খুনের মামলায় হেমায়েত উদ্দিন বীরবিক্রমকে আসামী করা হয় (দৈনিক সংবাদ, ১১ মার্চ, ১৯৭৩)। মামলাটি অদ্যাবধি বিচারাধীন বলে জানা গেছে।
সূত্র: দৈনিক কালের কণ্ঠ | The Daily Star
লিখেছেন : মতিউর রহমান
১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চের রাতের পর ১৯শে মার্চ তারিখে ঢাকার জয়দেবপুর সেনানিবাসে অবস্থানরত পাঞ্জাবি সৈন্যদের বিরুদ্ধে দ্বিতীয় ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের বিদ্রোহী সৈন্য এবং কর্মকর্তাগণ মুক্তিযুদ্ধকে সংগঠিত করার জন্য দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েন। বিদ্রোহী সৈন্যদের অন্যতম ব্যান্ডপার্টির হাবিলদার হেমায়েত উদ্দিন কয়েকজন সৈন্যকে নিয়ে ফরিদপুরে আসেন। এ সময় ফরিদপুরের স্থানীয় জনগণের সহযোগিতায় তিনি পাকিস্তানি সৈন্যদের প্রতিহত করলে বেশ কিছুদিন ফরিদপুর পাক সৈন্য মুক্ত থাকে। কিন্তু ঢাকা থেকে আধুনিক অস্ত্রসস্ত্রসহ পাকিস্তানি সৈন্যরা ফরিদপুর গেলে হেমায়েত উদ্দিন সঙ্গীদের নিয়ে ২৮ শে এপ্রিল নিজ গ্রাম কোটালিপাড়ার টুপুরিয়ায় সরে আসেন। এ সময় স্থানীয় রাজাকারেরা তাকে আত্মসমর্পন না করলে তার ছেলে এবং স্ত্রীকে ধরে নিয়ে যাওয়ার হুমকি প্রদান করে। হুমকির খবর শুনে হেমায়েতের স্ত্রী আত্মহত্যা করেন। হেমায়েত সেখান থেকে সরে গিয়ে স্থানীয় নেতৃবৃন্দের সহায়তায় মুক্তিবাহিনী গড়ে তোলেন। তিনি এবং তার সঙ্গীরা প্রথমেই কোটালিপাড়া থানা আক্রমন করে প্রচুর অস্ত্রশস্ত্র নিজেদের দখলে নেন।
হেমায়েত বাহিনী
কিছুদিনের মধ্যেই হেমায়েতের মুক্তিযোদ্ধাদের দলটি একটি বিরাট বাহিনীতে রূপ নেয়। এ বাহিনীতে সশস্ত্র মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা ছিল সর্বমোট ৫,৫৫৮ জন। এ বাহিনীর যুদ্ধক্ষেত্র বরিশালের উত্তরাঞ্চল, খুলনা-বাগেরহাট ও যশোরের কালিয়া সহ গোপালগঞ্জ এবং মাদারীপুরের পশ্চিমাংশ পর্যন্ত বিস্তৃত হয়। হেমায়েত বাহিনী পরিচালনার জন্য বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দের সমন্বয়ে একটি পরিচালনা কমিটি গঠন করা হয়েছিল। এ বাহিনী ৪২টি উপদলে বিভক্ত ছিল। প্রতিটি দলে কমান্ডার, সহকারী কমান্ডার নিযুক্ত করা হয়েছিল। তবে বিভিন্ন এলাকায় অভিযান পরিচালিত হত কেন্দ্রীয় ভাবে। মুক্তিযুদ্ধের শুরুতে কোটালিপাড়ার জহরেরকান্দি হাই স্কুলে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ কেন্দ্র স্থাপন করা হয়। হেমায়েত বাহিনীর মধ্যে বিচার বিভাগও ছিল। নিয়ম-শৃঙ্খলা ভঙ্গের কারণে ২ জন গ্রুপ কমান্ডার সহ মোট ৬ জন মুক্তিযোদ্ধাকে মৃত্যুদন্ড দেওয়া হয়েছিল।
তাঁর নেতৃত্বে ৩ ডিসেম্বর, ১৯৭১ তারিখে হেমায়েত বাহিনী গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়ায় প্রায় ৫০০ পাকিস্তানি সেনাকে পরাস্ত করে এই এলাকা শত্রুমুক্ত করে। ২ ডিসেম্বর রাতে ২৪ জন সাব কমান্ডার নিয়ে তিনি সিদ্ধান্ত নেন চূড়ান্ত আক্রমণের।
মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস সৃষ্টিকারী সেসব বিজয়গাথা শুনুন সেই বীর মুক্তিযোদ্ধার মুখেই:
"১৯৫৯ সালে ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টে যোগদানের পর প্রশিক্ষণ শেষে আমার প্রথম পোস্টিং হয় পশ্চিম পাকিস্তানে। পাকিস্তান সেনাবাহিনীর প্রশিক্ষক হিসেবে আমি সেখানে যোগদান করি। বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চ ভাষণের পর ৯ মার্চ স্ত্রী হাজেরা ও শিশুপুত্র হাসিবকে নিয়ে অ্যাবোটাবাদ ক্যান্টনমেন্ট ছেড়ে করাচিতে আসি। আবার ১৪ মার্চ পি আই এ'র একটি ফ্লাইটে ঢাকায় আসি। স্ত্রী-সন্তানকে সদরঘাট থেকে গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়ার টুপুরিয়ার গ্রামের বাড়িতে পাঠানোর জন্য একটি লঞ্চে তুলে দিই। এবং যোগ দিই ঢাকার জয়দেবপুরের ভাওয়াল রাজবাড়িতে দ্বিতীয় ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের সঙ্গে। পরে নিজ এলাকায় চলে আসি এবং নিজেই বাহিনী গড়ে তুলি। ৮ হাজার মুক্তিযোদ্ধাকে নিয়ে গড়ে তুলি হেমায়েত বাহিনী। আমাদের এই বাহিনীর লিয়াজোঁ কমিটি, জল্লাদ বাহিনী, প্রশিক্ষণ ইউনিট ও প্রশাসনিক ইউনিট নামে বেশ কয়েকটি কমিটি গঠন করা হয়েছিল। প্রশাসনিক ইউনিট মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য খাদ্য, অর্থ, রেশন, ওষুধ, জামা-কাপড় ও নৌকা সংগ্রহ করত। প্রতিটি ইউনিয়ন ও গ্রাম পর্যায়ে এই প্রশাসনিক ইউনিটের সাবকমিটি গঠন করা হয়েছিল। কোটালীপাড়ার কলাবাড়িতে চিত্তরঞ্জন গাইনের বাড়িতে একটি ট্রেনিং ক্যাম্প গড়ে তুলি, যেখানে পুরুষের পাশাপাশি নারীদেরও সামরিক ট্রেনিং দেয়া হতো। প্রথমে ৮০ জনের একটি দলকে ৩০৩ রাইফেল খোলা, জোড়া লাগানো, এইম করা এবং ফায়ারিং করা শিখিয়েছি। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে বেশ কয়েকটি সম্মুখযুদ্ধে অবতীর্ণ হয় আমাদের 'হেমায়েত বাহিনী'। উল্লেখযোগ্য যুদ্ধ হয় রামশীল, হরিণাহাটি, শেখ বাড়ির যুদ্ধ, কলাবাড়ির যুদ্ধ, মাটিভাঙ্গা, বাঁশবাড়িয়া, ঝনঝনিয়া, জহরের কান্দি, কোটালীপাড়া সদর প্রভৃতি স্থানে। এ ছাড়া ছোটখাটো যুদ্ধ হয়েছে আরো কয়েকটি। স্বাভাবিকভাবেই এসব যুদ্ধের নেতৃত্ব দিয়েছি আমি।
প্রথম যুদ্ধ
আমরা তিন তিনবার কোটালীপাড়া থানা আক্রমণ করেছি। প্রতিবারই বীরত্বের সঙ্গে সফল হয়েছি এবং অস্ত্র লুটে নিয়েছি। সেই অস্ত্র আমরা যুদ্ধে ব্যবহার করেছি। হেমায়েত বাহিনীর কোটালীপাড়ায় প্রথম যুদ্ধ হয় ২৮ এপ্রিল। সেদিনই আমি প্রথম গ্রামে প্রবেশ করি। এ খবর ছড়িয়ে পড়লে এলাকার লোকজন আমাকে দেখার জন্য ভিড় করতে থাকে। এদিন সকাল ৯টার দিকে কোটালীপাড়া থানা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদকের লেখা একটি চিঠি আসে আমার কাছে। চিঠিতে লেখা ছিল আওয়ামী লীগের ২৫-২৬ নেতা-কর্মীকে নজরবন্দী অবস্থায় থানায় আটকে রাখা হয়েছে। তাদের প্রাণে বাঁচানোর জন্য বিশেষ অনুরোধ করা হয়। চিঠিটি সহযোগীদের পড়ে শুনাই এবং সিদ্ধান্ত নিই তাদের উদ্ধারের। দেরি না করে আমরা তখনই থানার দিকে রওনা হই। কোটালীপাড়া থানা এলাকায় পৌঁছে আমি দুটি মেশিনগান থানার দিকে তাক করে অবস্থানের নির্দেশ দিই এবং নিজের এসএমজি'টি ফায়ারিং পজিশনে রেখে থানায় প্রবেশ করি। আমার সাজসজ্জা এবং লোকবল দেখে থানার সব পুলিশ ভয় পেয়ে যায়। কোনো যুদ্ধ ছাড়াই থানায় আটক আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীদের মুক্ত করে আনি। পরে ওই সব নেতাও হেমায়েত বাহিনীতে যোগ দেন।
ঢাকা জাতীয় প্রেসক্লাবে একটি বইয়ের প্রকাশনা অনুষ্ঠানে হেমায়েত উদ্দিন বীরবিক্রম (বামে), ড. আকবর আলী খান, মুক্তিযোদ্ধা রাজ্জাক হাওলাদার ও কবি বেলাল চৌধুরী।
তবে জীবনের শেষ সময়ে দাঁড়িয়ে অনেক দুঃখ আর ক্ষোভ জমে আছে আমার মনের মধ্যে। জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে সেদিন আমরা মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলাম। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ছিল জনযুদ্ধ। যে সব শ্রমিক, কৃষাণ ও সাধারণ মানুষ যুদ্ধ করে এ দেশের স্বাধীনতা এনেছে তাদের মূল্যায়ন হয়নি। বিশেষ করে আমার দলে থাকা ৮ হাজার মুক্তিযোদ্ধাও মূল্যায়ন পাননি। এই বেদনা কখনো ভুলে যাওয়ার নয়।" হেমায়েত উদ্দিন মুক্তিযুদ্ধে কৃতিত্বের স্বীকৃতি হিসেবে 'বীর বিক্রম' খেতাবে ভূষিত হন।
হেমায়েত উদ্দিন ১৯৪১ সালের ৩রা ডিসেম্বর গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়া উপজেলার টুপুরিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতার নাম শেখ আবদুল করিম এবং মা ছখিনা বেগম।
হেমায়েত উদ্দিন বীরবিক্রম বর্তমানে 'বঙ্গবন্ধু একাডেমী' নামে একটি সংগঠনের সভাপতি।
স্বাধীনতার পর ১৯৭৩ সালের সাধারণ নির্বাচনের প্রাক্কালে ফরিদপুরের একটি আসনে প্রতিদ্বদন্ধী ন্যাপ (মোজাফ্ফর)-এর প্রার্থী কমলেশ বেদজ্ঞসহ ৪ খুনের মামলায় হেমায়েত উদ্দিন বীরবিক্রমকে আসামী করা হয় (দৈনিক সংবাদ, ১১ মার্চ, ১৯৭৩)। মামলাটি অদ্যাবধি বিচারাধীন বলে জানা গেছে।
সূত্র: দৈনিক কালের কণ্ঠ | The Daily Star
লিখেছেন : মতিউর রহমান


0 Responses to "হেমায়েত উদ্দিন বীরবিক্রম"
Leave A Comment :